আল-আকসা মসজিদ চত্বরে প্রার্থনা: এক স্পর্শকাতর পদক্ষেপ
বন্ধুরা, কেমন আছো সবাই? আজ আমরা এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে কথা বলব, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। খবরটা হলো, ইসরায়েলের কট্টরপন্থী নেতা ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির সম্প্রতি আল-আকসা মসজিদ চত্বরে প্রকাশ্য প্রার্থনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই ঘটনা শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের বিষয় নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে বহু পুরনো ইতিহাস, সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম ভাঙার অভিযোগ। চলো, জেনে নিই এই ঘটনাটি কেন এত আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং এর তাৎপর্য কী।
জেরুজালেমের ওল্ড সিটিতে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পবিত্র স্থান। একই স্থানে ইহুদিরা তাদের দ্বিতীয় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে বলে বিশ্বাস করে, যা ‘টেম্পল মাউন্ট’ নামে পরিচিত। দীর্ঘকাল ধরে এখানে একটি অলিখিত নিয়ম চলে আসছে – ইহুদিরা এই স্থানে প্রবেশ করতে পারবে, কিন্তু প্রকাশ্যে প্রার্থনা করতে পারবে না। কিন্তু গত রোববার এই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে ইতামার বেন গভির নিজেই আল-আকসা মসজিদ চত্বরে প্রার্থনা করেছেন। তাঁর সাথে যোগ দিয়েছিল কয়েকশ ইহুদি বসতিস্থাপনকারী, যারা কড়া পুলিশি পাহারায় উচ্চস্বরে ইহুদি রীতি অনুযায়ী প্রার্থনা করে মুসলিমদের উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করে।
ভিডিওতে যা দেখা গেল: পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগ
‘মিডল ইস্ট আই’ এই ঘটনার বেশ কিছু ভিডিও দেখেছে, যেখানে দেখা গেছে শত শত বসতিস্থাপনকারী আল-আকসা মসজিদ চত্বরে অনুপ্রবেশ করছে। ভিডিওতে কিছু লোককে নাচতে ও হৈহুল্লোড় করতেও দেখা গেছে, যা মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘন বলে মনে করা হচ্ছে। এমন ঘটনা এর আগেও ঘটেছে, কিন্তু একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর নেতৃত্বে এমন প্রকাশ্য প্রার্থনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কেন এই জায়গাটি এত স্পর্শকাতর?
আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনায় নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অনেক দশক ধরে মেনে আসা হচ্ছিল। এই ‘স্থিতাবস্থা’ (status quo) মূলত ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে চলে আসছে, যেখানে জর্ডান আল-আকসার অভিভাবকত্ব পেয়েছিল। পরে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করলেও এই পবিত্র স্থানের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে একটি সমঝোতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইহুদি গোষ্ঠীগুলো গত শতকে বারবার এই ভঙ্গুর ব্যবস্থাপনা লঙ্ঘন করেছে। শুধু তাই নয়, ইসলাম ধর্মের অন্যতম পবিত্র স্থানটির ওপর নজিরবিহীন হামলা চালানোর অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। তাদের দাবি অনুযায়ী, সেখানে একসময় ইহুদি উপাসনালয় ছিল, যা মুসলিমদের কাছে হারাম আল-শরিফ বা আল-আকসা মসজিদ চত্বর নামে পরিচিত। এই বিতর্ক দুই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনা জিইয়ে রেখেছে।
স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা: যেন এক সামরিক ঘাঁটি
জেরুজালেমের ওল্ড সিটির বাসিন্দারা জানান, বেন গভির আসার আগে ও পরে পুরো এলাকাটিকে ‘একটি সামরিক ঘাঁটির’ মতো মনে হচ্ছিল। সেখানে অসংখ্য তল্লাশিচৌকি বসানো হয় এবং ইসরায়েলি সেনারা নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার করেছিল। স্থানীয়রা আরও জানান, বেন গভিরের পরিদর্শনের সময় ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনিদের মসজিদে প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। শুধু অল্পসংখ্যক স্থানীয় বাসিন্দাকে ওই স্থানে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়, যা তাদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
বেন গভিরের বার্তা ও কট্টরপন্থী এজেন্ডা
পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বেন গভির স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘টেম্পল মাউন্ট ইহুদিদের জন্য। আমরা চিরদিন এখানে থাকব।’ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে বেন গভির অন্তত ১১ বার আল-আকসা মসজিদ চত্বরে অনুপ্রবেশ করেছেন। এই ঘটনাগুলো তার চরমপন্থী রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ বলে মনে করা হয়, যেখানে তিনি চান আল-আকসা মসজিদ ধ্বংস করে সেখানে একটি ইহুদি উপাসনালয় নির্মাণ করা হোক।
রোববার আল-আকসা পরিদর্শনের সময় ডানপন্থী লিকুদ পার্টির আইনপ্রণেতা আমিত হালেভিও উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, এই আমিত হালেভি গাজায় পানি, খাদ্য ও জ্বালানির সব উৎস ধ্বংস করতে বারবার ইসরায়েল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন, যা তার চরমপন্থী মনোভাবের একটি ইঙ্গিত দেয়। এমন উসকানিমূলক পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভ এবং হতাশা বাড়াচ্ছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে কীভাবে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান সম্ভব, তা জানতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জেনে নিতে পারো।
এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাধারণত এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপের নিন্দা জানায়, কারণ এগুলো পবিত্র স্থানের স্থিতাবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। এই ধরনের উসকানিমূলক কাজগুলো কেবল উত্তেজনা বৃদ্ধি করে এবং সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে। আল-আকসা মসজিদের এই স্পর্শকাতরতা এবং এর ওপর ক্রমাগত চাপ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের কাছে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, কীভাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়, তা এক বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ নিউজ২৪ এর মতামত: আল-আকসা মসজিদ চত্বরে প্রার্থনা-কে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি মন্ত্রীর এই পদক্ষেপ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের একটি প্রতীকী চিত্র। এমন স্পর্শকাতর স্থানে কোনো একতরফা পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে। আন্তর্জাতিক আইন ও পবিত্র স্থানের মর্যাদা রক্ষা করা সবার কর্তব্য। আপনার কী মনে হয়, এই ধরনের ঘটনার পরিণতি কী হতে পারে? আপনার মূল্যবান মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান। আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর জানতে ভিজিট করুন: bdnews24us.com
ইসরায়েলি কট্টরপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের আল-আকসা মসজিদ চত্বরে প্রকাশ্য প্রার্থনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জানুন এর পেছনের কারণ ও ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়া।


