জুন বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রূপান্তর: আমাদের স্বপ্ন ও বাস্তবতা!
বন্ধুরা, কেমন আছো সবাই? চলো আজ একটু সিরিয়াস কিন্তু খুবই জরুরি একটা বিষয় নিয়ে কথা বলি – সেটা হলো, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের রূপান্তর। গত বছরের ২রা আগস্টের সেই দিনটার কথা মনে আছে? যখন অসংখ্য মানুষ একাট্টা হয়ে ‘দ্রোহযাত্রা’য় নেমেছিল? সেই দিন আমিও বলেছিলাম, ‘শুধু একটা সরকারের পতনই বাংলাদেশের মুক্তি এনে দেবে না। বারবার স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মাথাচাড়া দেওয়া বন্ধ হবে না। মুক্তিযুদ্ধকে লুটেরাদের হাত থেকে মুক্ত করে জনগণের হাতে ফিরিয়ে আনতে হবে। লুটপাট, দুর্নীতি, পরিবেশ ধ্বংসকারী উন্নয়নের নামে জনগণের ওপর আর আক্রমণ চলবে না।’
বলেছিলাম, ‘হাসিনা সরকারের পদত্যাগ ছিল অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এর পরের ধাপটা হলো, কীভাবে আমরা একটা বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ব, সেটাই এখন আমাদের প্রধান আলোচ্য বিষয়।’ সেদিন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পেশাজীবী, শ্রমিক—সবার সম্মিলিত কাজের গুরুত্বের কথা বলেছিলাম। কিন্তু এক বছর পর মনে হচ্ছে, এই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার পথে আমাদের দুর্বলতাগুলো বড় বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উল্টো বৈষম্যবাদী, অগণতান্ত্রিক শক্তিগুলো আরও বেশি দাপট দেখাচ্ছে। কিন্তু চিন্তার কিছু নেই, পথ তো আছেই!
গণ-অভ্যুত্থানের অবিশ্বাস্য সাফল্য
তবে, এই পরিস্থিতি দেখে গত জুলাইয়ে শিক্ষার্থী, শ্রমিক আর সাধারণ মানুষের সেই অসাধারণ গণ-অভ্যুত্থানের গুরুত্বকে কিন্তু ছোট করে দেখলে চলবে না। এই সাফল্যগুলো আমাদের মনে রাখা খুবই জরুরি:
- প্রথমত, যে সরকার সম্পূর্ণ দুর্নীতিতে ডুবে ছিল, অত্যাচারী ছিল এবং জোর করে ক্ষমতায় টিকে ছিল, তার পতন ঘটেছে। এটা একটা বিরাট ব্যাপার!
- দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিনের নির্যাতন, হুমকি, রাষ্ট্রীয় গুম আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলো বন্ধ হয়েছে। যদিও এখন আবার কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা শোনা যাচ্ছে, তবুও আগের তুলনায় পরিস্থিতি অনেক ভালো।
- তৃতীয়ত, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য উদ্যোগের মাধ্যমে আলোচনা আর বিতর্কের একটা জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সবারই যেন কিছু বলার আছে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা আছে, নানা ধরনের মত-ভিন্নমত আছে। একটা বড় পরিবর্তনের আশা তৈরি হওয়া এবং সে বিষয়ে সরব হওয়াটা একটা বিশাল সাফল্য। এখন যে নানা রকম ভয় আর সংশয় তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেগুলো মোকাবিলা করা আমাদেরই দায়িত্ব।
এই গণ-অভ্যুত্থানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যও মনে রাখা দরকার, যা আমাদের সামনের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে:
- প্রথমত, অতীতের সব আন্দোলনের মতোই এবারও তরুণেরাই ছিলেন সামনের সারিতে। যদিও বিভিন্ন দল, সংগঠন ও অসংখ্য সাধারণ মানুষের ভূমিকা ছিল, তবে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব ছিল না।
- দ্বিতীয়ত, এবার নারী, শ্রমজীবী মানুষ, লিঙ্গীয়-ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
- তৃতীয়ত, ডিজিটাল প্রযুক্তির ভূমিকা ছিল অসাধারণ! মুহূর্তের মধ্যে খবর মানুষের কাছে পৌঁছেছে, নৃশংসতার ভিডিও আর প্রতিরোধের চিত্রগুলো মানুষকে একত্রিত করেছে, আর আন্দোলনকারীরা একে অপরের সাথে যুক্ত থাকতে পেরেছে।
- চতুর্থত, যেহেতু কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না, তাই অসংখ্য ছোট ছোট কেন্দ্র তৈরি হয়েছিল। স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আর নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ ছিল এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
- পঞ্চমত, দেয়ালগুলোতে কাঁচা হাতে আঁকা ছবিগুলোতে একটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছিল। গান, তথ্যচিত্র, লেখা, কার্টুন—সবকিছুতেই ধর্ম, জাতি, শ্রেণি ও লিঙ্গীয় বৈষম্য দূর করে সমতার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন উঠে এসেছিল।
বৈষম্যের নানা মুখ: কিসের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই?
এই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আমাদের বুঝতে হবে বৈষম্য আসলে কোথায় কোথায় লুকিয়ে আছে। গত পাঁচ দশকে আমাদের দেশে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। অবকাঠামো বেড়েছে, জিডিপি বহুগুণ বেড়েছে, আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের পরিমাণও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। কিন্তু একই সাথে শ্রেণিবৈষম্যও বেড়েছে ভয়াবহভাবে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মজীবী মানুষই স্থায়ী কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত। দেশের সিংহভাগ সম্পদ চলে গেছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে, যাদের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশের দখলেই বেশিরভাগ। এই মানুষগুলোর কারণেই দেশের বিপুল সম্পদ লুটপাট ও পাচার হয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে, আর বারবার দেশ স্বৈরশাসনের জালে আটকে পড়েছে। নদী, বন, পাহাড়, বাতাস—সবকিছুই বিপর্যস্ত। শ্রমিকদের জীবনে অনিশ্চয়তা, বঞ্চনা আর জুলুম যেন শেষই হচ্ছে না।
আমাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান শ্রেণিবৈষম্যের এক করুণ দৃষ্টান্ত। এগুলোর লাগামহীন বাণিজ্যিকীকরণের কারণে জনসংখ্যার একটা বড় অংশের প্রকৃত আয় কমেছে। সন্তানদের পড়াশোনা করানো বা নিজেদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে জনমুখী করা খুব জরুরি।
দ্বিতীয়ত, ঘরে-বাইরে আইনে-কানুনে লিঙ্গীয় বৈষম্য এখনো প্রকট। সম্পত্তি, সন্তানের অধিকার, খেলাধুলা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা—এসব ক্ষেত্রে এখনো নারীদের নানা রকম বাধার সম্মুখীন হতে হয়। নারীর নিরাপদ জীবন, শিক্ষা, কাজ আর স্বাধীন সিদ্ধান্তের ক্ষমতা নানা প্রতিকূলতার শিকার। এমনকি লিঙ্গীয় বৈচিত্র্যও হুমকির মুখে।
তৃতীয়ত, জাতিগত ও ভাষাগত বৈষম্য। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়া অন্য জাতিসত্তা ও ভাষাভাষীর অস্তিত্ব সাংবিধানিকভাবে সেভাবে স্বীকৃত নয়। উল্টো তাদের জমি, ভাষা, সংস্কৃতি—সবকিছুই দখলদারদের থাবার মুখে। এর ওপর সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাহীনতা তো আছেই। গণ-অভ্যুত্থানের পরেও তাদের আক্রান্ত হতে হয়েছে, এটা খুবই দুঃখজনক।
চতুর্থত, ধর্মীয় বৈষম্য। শুধু সংখ্যাগুরু থেকে ভিন্ন ধর্মের মানুষই বৈষম্যের শিকার নয়, একই ধর্মের মধ্যেও সংখ্যালঘু বা দুর্বল গোষ্ঠী বৈষম্য আর নিপীড়নের শিকার। গুজব ছড়িয়ে তাদের ওপর গণ-সন্ত্রাস যেন এখন নিয়মিত ঘটনা।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ ও দুর্বলতা
গত এক বছরে সংস্কার কমিশনগুলো গঠন করা এবং তাদের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা এই সরকারের একটি বড় সাফল্য। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এসব প্রতিবেদনে আশু সংস্কার বা অন্তর্বর্তী সরকারের যে কাজগুলো করা উচিত ছিল, সেগুলোতে তেমন মনোযোগ দেওয়া হয়নি। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার করা ছিল এই সরকারের বড় দায়িত্ব। কিন্তু লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, চিকিৎসকসহ অসংখ্য ব্যক্তির নামে পাইকারি মামলা, শত শত অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে মানুষকে হয়রানি করা, মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি—এসবের কারণে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াটা হালকা ও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
এই বছর নাটক, বাউলগান, মেলা, মাজার, এমনকি ধর্মের ভিন্ন ধারার মসজিদ, মন্দির, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—এগুলোর ওপর একের পর এক হামলা হয়েছে। নারীবিদ্বেষী, অপমানজনক বক্তব্য ছড়িয়েছে, সরাসরি হামলাও হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতা যেন আরও বেড়েছে।
গত এক বছরে আমরা দেখেছি, দেশের বিভিন্ন বঞ্চিত জনগোষ্ঠী যখন তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছে, তখন তাদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। কিন্তু যারা ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণ-সন্ত্রাস করে, তাদের প্রতি সরকারের নমনীয়তা দেখা গেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জোর করে কাউকে বসানো, কাউকে নামানো, নারী শিক্ষক, লেখক ও পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো—এসব যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারখানা খোলা বা বকেয়া মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের বারবার আন্দোলনে নামতে হয়েছে। তাদের ওপর গুলিও চলেছে। কাজের দাবিতে বহু সভা-সমাবেশ হলেও সরকার তাতে মনোযোগ দেয়নি। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে ধরপাকড় করা হয়েছে। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার ১৮ দফা চুক্তি করলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হওয়ায় লক্ষাধিক মানুষ বেকার হয়েছে, দারিদ্র্য বেড়েছে।
হাসিনা মডেলের নেপথ্যের শক্তি
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দুর্নীতি আর লুটপাটের অনেক তথ্য এখন সবার জানা। কিন্তু যে নীতির কারণে এই লুণ্ঠন আর সম্পদ পাচারের মডেলটা তৈরি হয়েছিল, তার প্রধান কারিগর হলো বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি আর জাইকা গোষ্ঠী। এরা একদিকে যেমন বহুজাতিক পুঁজির প্রতিনিধি, অন্যদিকে দেশের লুটেরা গোষ্ঠীর মুরুব্বি বা পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। বড় সমস্যা হলো, এর ফলাফল ভয়াবহ হলেও তাদের কোনো জবাবদিহি থাকে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বাণিজ্যিকীকরণ, পাটশিল্পের বিপর্যয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের চোরাবালি সংকট, রেলওয়ের গতিহীনতা, পানিসম্পদের অব্যবস্থা, নদীর দূষণ-দখল, বন বিনাশ—প্রতিটির পেছনে এদের বিভিন্ন প্রকল্প আছে। এদের সাথে বাংলাদেশের পরামর্শক, অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ, আমলাতন্ত্র থাকে; থাকে বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যারা এসবের সুবিধাভোগী। এটা একটা সম্মিলিত জোট, যাকে বিশ্বজোটও বলা যেতে পারে। দেশে অতিধনী লুটেরা গোষ্ঠী তৈরির এই মডেল তাই বরাবর এদের সমর্থন ও প্রশংসা পেয়েছে।
আশ্চর্যজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারও আগের সরকারের মতোই বিদেশি কোম্পানি-নির্ভর, ঋণ-নির্ভর, আমদানি-নির্ভর নানা চুক্তি করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে, যদিও তাদের এখতিয়ার নেই। পেট্রোবাংলাকে না জানিয়ে মার্কিন কোম্পানি থেকে এলএনজি আমদানির চুক্তি করা হয়েছে। মার্কিন কোম্পানি থেকে ২৫টি বোয়িং কেনার চুক্তি করার কথাও বলা হয়েছে, তাও কারো সাথে আলোচনা না করেই। ট্রাম্পের আদেশ মানতে সে দেশ থেকে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রসহ শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানি, তাদের দাবি অনুযায়ী সব বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর মজার ব্যাপার হলো, জনগণের কাছ থেকে এসব তথ্য গোপন রাখা হয়েছে!
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ও লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য কোনো টেন্ডার ছাড়াই সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তির হাসিনা-প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখাচ্ছে সরকার। প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ বিদেশি কোম্পানির লবিস্টদের কথা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। চট্টগ্রাম বন্দরের সব ট্যারিফ ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে বিদেশি কোম্পানি এসে খুব সহজে বড় মুনাফা পেতে পারে। মনে হচ্ছে, সরকারের অগ্রাধিকার জনগণ নয়, বহুজাতিক পুঁজির স্বার্থ।
জনস্বার্থে কী কী করা জরুরি?
এই পরিস্থিতিতে নাগরিক ও সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া আর সক্রিয় থাকা খুব জরুরি:
- অসহিষ্ণুতা, মব-সন্ত্রাস, পাইকারি মামলা, হয়রানি আর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সামাজিক ও মতাদর্শিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যাতে সরকারের ভূমিকারও ইতিবাচক পরিবর্তন হয়।
- বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের ইতিহাস সবসময় সামনে রাখা। তেভাগা, টঙ্ক, হাজংসহ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ১৯৬০-এর দশকের সামরিক শাসনবিরোধী লড়াই ও ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীনতার পর স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসনবিরোধী লড়াই ও ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান, দেড় দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী লড়াই এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান—সবই উজ্জ্বলভাবে জাতীয় স্মরণে রাখতে হবে। সবার ওপর রাখতে হবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার বাঙালি দোসর আলবদর-রাজাকারদের ভয়ংকর গণহত্যা ও জুলুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সব জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ ও শ্রেণির মানুষের অসম্ভব সাহসী প্রতিরোধযুদ্ধের স্মৃতি ও অঙ্গীকার।
- প্রাণ, প্রকৃতি, নদী, বন-জঙ্গল আর উন্মুক্ত স্থান ধ্বংসকারী কোনো প্রকল্পকে উন্নয়ন হিসেবে গ্রহণযোগ্য না করা, এটা নিশ্চিত করা। রামপাল, মাতারবাড়ী, বাঁশখালী, রূপপুরসহ এমন সব প্রকল্প বাতিলের পথ তৈরি করা। বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল ‘নয়া উদারতাবাদী’ অর্থনৈতিক মডেল থেকে বেরিয়ে এসে সর্বজন ও সর্বপ্রাণমুখী মডেল দাঁড় করানো। জনসম্মতি ছাড়া গোপনে দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি থেকে বিরত থাকা এবং অতীতের সব চুক্তি প্রকাশ করা।
- শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন ধারা, স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা পরিবর্তনে অগ্রাধিকার দেওয়া।
- নারীর চলাফেরা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক তৎপরতা বাধামুক্ত ও নিরাপদ করতে সমাজে জোরালো জনমত তৈরি করা।
- সারা দেশে গান, নাটক, মেলা, আলোচনা, পাঠাগার, চলচ্চিত্রসহ সাংস্কৃতিক তৎপরতা সব বাধা ও হুমকি থেকে মুক্ত করে তার বিস্তারের পথ নিশ্চিত করা।
- প্রতিহিংসা ও বলপ্রয়োগের অপসংস্কৃতি পরাজিত করে মতের বদলে মত, লেখার বদলে লেখার সংস্কৃতি জোরদার করা।
- জাতীয় সংসদসহ সব পর্যায়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
- ধর্ম, জাতি, লিঙ্গপরিচয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত করে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার পথ তৈরি করা। সমাজে বৈচিত্র্যকে উদ্যাপন করা, রক্ষা করা; বৈষম্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অবস্থান গ্রহণ করা।
- রাজনৈতিক দলের সংস্কারের প্রশ্নও এখানে প্রাসঙ্গিক। কয়েকটা পরিবর্তন খুব গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, রাজনৈতিক দলের নেতাদের অবসরের বয়স ঠিক করা, যাতে চিরদিন নেতা থাকার সংস্কৃতির অবসান ঘটে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সব পর্যায়ের কমিটি প্রকাশ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠন করা। আনুগত্য এবং লেনদেনের মধ্য দিয়ে কমিটি গঠনের অগণতান্ত্রিক চর্চা বন্ধ করা। তৃতীয়ত, জাতীয় রাজনৈতিক দলে সমাজের সব বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। মানে নারী, পুরুষ, অন্য লিঙ্গ, অন্যান্য ধর্ম, বিভিন্ন বিশ্বাস—তাদের সবার প্রতিনিধিত্ব নিয়েই কোনো দল নিজেকে জাতীয় রাজনৈতিক দল বলতে পারবে।
গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানেরও বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই স্বপ্নকে ম্লান হতে দেওয়া যাবে না। অতীতের মতো শুধু নেতানেত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নীরব সৈনিকের ভূমিকা পালনের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে নাগরিকেরা নিজেরা স্বপ্ন দেখা ও তা বাস্তবায়নের সাহস করতে পারলেই যথাযথ পরিবর্তনের পথ তৈরি হবে। তার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম বিস্তৃত করতে হবে। পরিবর্তন যে সম্ভব, গত গণ-অভ্যুত্থান হচ্ছে তার একটা প্রমাণ। তার ওপর ভর করে আরও বড় পরিবর্তনও সম্ভব।
বন্ধুরা, আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে—আমাদের ইতিহাস শুধু মার খাওয়ার ইতিহাস নয়, আমাদের ইতিহাস প্রতিরোধেরও ইতিহাস, নতুন কিছু তৈরির ইতিহাস। চলুন, সবাই মিলে এই বাংলাদেশের রূপান্তরকে সফল করি। আমাদের সাথে থাকতে ভিজিট করুন: bdnews24us.com
বাংলাদেশ নিউজ২৪ এর মতামত: আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ আমাদের হাতেই। জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আসুন, বৈষম্যহীন এক সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি এবং তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হই। আপনার মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান!
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রূপান্তর নিয়ে জানুন। কীভাবে বৈষম্যহীন সমাজ গড়া সম্ভব, বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো কী এবং সামনে কী করা জরুরি? আনু মুহাম্মদের গভীর বিশ্লেষণ।


