Bangladesh Ex IGP Political Confession

সাবেক আইজিপির জবানবন্দি: হেলিকপ্টার থেকে গুলি, রাতের ভোট ও গুম—পর্দার আড়ালের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য!

বন্ধুরা, রাজনীতিতে এমন কিছু সত্য থাকে যা প্রকাশ পেলে পুরো দেশ তোলপাড় হয়ে যায়!

কেমন আছেন সবাই? আজ এমন এক খবর নিয়ে এসেছি যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অনেক অন্ধকার অধ্যায়ের ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তা কোনো সাধারণ বিবৃতি নয়, বরং এটি ক্ষমতার করিডোরে ঘটে যাওয়া বহু ভয়ঙ্কর ঘটনার এক জীবন্ত দলিল। এই জবানবন্দিতে উঠে এসেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনের ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা, ২০১৮ সালের রাতের ভোটের নির্দেশ, এবং রাষ্ট্রীয় মদদে গুম ও গোপন বন্দিশালার মতো চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। চলুন, কোনো রকম রাখঢাক না করে সরাসরি জেনে নেওয়া যাক সেইসব অজানা কথা, যা এতদিন ছিল পর্দার আড়ালে।

জুলাই আন্দোলন দমনের ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা: হেলিকপ্টার থেকে গুলি!

২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে আছে? বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিচ্ছিল, তখন তাকে দমনের জন্য কী কী করা হয়েছিল, তা শুনলে আপনি শিউরে উঠবেন। সাবেক আইজিপি তাঁর জবানবন্দিতে পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ছাত্র-জনতার ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর সিদ্ধান্তটি ছিল সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’

তিনি বলেন, “আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে একপর্যায়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আন্দোলনকে নজরদারি, গুলি করা ও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গোপন পরিকল্পনা করা হয়।” এই ভয়ংকর পরিকল্পনার পেছনে ছিলেন তৎকালীন র‍্যাবের ডিজি হারুন অর রশিদ এবং এতে সেনাবাহিনীরও সহযোগিতা নেওয়া হয়েছিল। সবচেয়ে মারাত্মক তথ্যটি হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশেই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আইজিপিকে এ কথা জানিয়েছিলেন। ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং ডিবির প্রধান হারুন অর রশীদ এই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে অতি উৎসাহী ছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রাতের আঁধারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় বৈঠক: কারা ছিলেন সেই ‘কোর কমিটি’-তে?

আন্দোলনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় ১৯ জুলাই থেকে প্রায় প্রতি রাতেই বসত এক গোপন বৈঠক। এই ‘কোর কমিটি’র বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা। সাবেক আইজিপি মামুনের ভাষ্যমতে, বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন:

  • স্বরাষ্ট্রসচিব ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা
  • এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম
  • ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ (যাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘জিন’ নামে ডাকতেন)
  • র‍্যাবের ডিজি হারুন অর রশিদ
  • ডিএমপি কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান
  • বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানগণ

এই বৈঠকগুলোতেই আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটক করার সিদ্ধান্ত হয় এবং সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিজিএফআই ও ডিবিপ্রধান হারুনকে। সাবেক আইজিপি জানান, তিনি এর বিরোধিতা করলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে তা কার্যকর করা হয়। আটককৃত সমন্বয়কদের ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয় এবং টেলিভিশনে বিবৃতি দিতে বাধ্য করা হয়।

২০১৮-র নির্বাচন: ‘রাতের ভোট’ নিয়ে আইজিপির ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রাতের ভোট’ একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এই প্রথম কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার মুখ থেকে এর স্বীকারোক্তি মিলল। চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন জবানবন্দিতে বলেছেন, “২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় আমি ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে কর্মরত ছিলাম। তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাতের বেলায় ব্যালট বাক্সে প্রায় ৫০ শতাংশের মতো ব্যালট পেপার ভরে রাখার পরামর্শ দেন বলে শুনেছি।”

তিনি আরও বলেন, “মাঠপর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে রাতে ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা প্রেরণ করা হয়।” এই কাজে রাজনৈতিক নেতা, জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং ওসিরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এই স্বীকারোক্তি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে চলমান বিতর্ককে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

গুম ও গোপন বন্দিশালা: র‍্যাবের সেই ‘TFI সেল’ এবং ব্যারিস্টার আরমানের পরিণতি

গুম বা এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স বাংলাদেশের জন্য একটি গভীর ক্ষত। সাবেক আইজিপি, যিনি একসময় র‍্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন, এই বিষয়েও মুখ খুলেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, র‍্যাবের সদর দপ্তরে ‘টিএফআই সেল’ নামে একটি গোপন বন্দিশালা ছিল। রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের তুলে এনে সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন এবং আটক রাখা হতো।

তিনি বলেন, “এই কাজগুলো প্রধানত র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি, অপারেশনস) এবং র‍্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকেরা সমন্বয় করতেন।” তিনি আরও জানান, গুম বা ক্রসফায়ারের মতো গুরুতর নির্দেশনাগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বা তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক সিদ্দিকের কাছ থেকে আসত। অনেক ক্ষেত্রে র‍্যাব আইজিপির ‘চেইন অব কমান্ড’ মানত না।

দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা ব্যারিস্টার আরমান যে টিএফআই সেলে বন্দী ছিলেন, সে বিষয়টিও তিনি জানতেন বলে স্বীকার করেছেন। তাঁর পূর্বসূরি বেনজির আহমেদ দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করেন। এই জবানবন্দি গুম হওয়া শত শত পরিবারের ক্ষতে নতুন করে লবণ ছিটিয়ে দেওয়ার মতোই।

সরকারের শেষ দিনগুলো: গণভবনের সেই রুদ্ধশ্বাস বৈঠক

সরকার পতনের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ৪ আগস্ট, গণভবনে শেখ হাসিনা দুটি জরুরি বৈঠক করেছিলেন। সকালের বৈঠকে তিন বাহিনীর প্রধানসহ নিরাপত্তা কমিটির সদস্যরা ছিলেন, যেখানে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয় আন্দোলন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু সরকার নিজের দুর্বলতা শুনতে প্রস্তুত ছিল না।

রাতে আবার বৈঠক ডাকা হয়। সেখানে শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং তিন বাহিনীর প্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ৫ আগস্টের গণজমায়েত দমনের পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু পরদিন সকালে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সাবেক আইজিপির ভাষায়, “বেলা ১১টার দিকে উত্তরা থেকে লাখ লাখ লোক ঢাকার ভেতরে আসতে শুরু করেন। তখন জানতে পারি যে সেনাবাহিনী বাধা দেয়নি। সেনাবাহিনীর মাঠপর্যায়ের অফিসার ও ফোর্স আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন।” দুপুর নাগাদ তিনি বুঝতে পারেন যে সরকারের পতন আসন্ন।

উপসংহার: এক অনুতপ্ত স্বীকারোক্তি এবং জাতির জন্য শিক্ষা

পাঁচ পৃষ্ঠার জবানবন্দির শেষে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন তাঁর কৃতকর্মের জন্য লজ্জা, অনুতাপ এবং ক্ষমা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “সাবেক পুলিশপ্রধান হিসেবে আমি লজ্জিত, অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী।” তাঁর এই স্বীকারোক্তি শুধু একজন ব্যক্তির অনুশোচনা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার চিত্র। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ একটি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। এই সত্যগুলো জানা আমাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভবিষ্যতের জন্য এই সত্যের মুখোমুখি হওয়া অপরিহার্য।

বাংলাদেশ নিউজ২৪ এর মতামত: সাবেক আইজিপির এই চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি শোনার পর আপনার অনুভূতি কী? দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এই স্বীকারোক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের কমেন্টে জানান।

Explosive confession by ex-IGP of Bangladesh reveals political orders for helicopter shootings, 2018 election rigging, and secret detention cells. A must-read.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top